ঢাকারবিবার, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১১:৪৪
আজকের সর্বশেষ সবখবর

হোমপেজ আর্টস হোম সাক্ষাৎকার প্রবন্ধ অনুবাদ উপন্যাস উইপিং উইলো ও নিহা- তৃতীয় পর্ব

admin
মার্চ ৯, ২০২২ ১০:৩২ অপরাহ্ণ
পঠিত: 122 বার
Link Copied!

সাইদের সাথে এমন ভাবে নীরব এক রাতে হেটে বেড়াবে ডালাসের এক লেকের পাড়ে, নিহা কি ভেবেছে কখনো। ভাবেনি। কিন্তু হাটছে। মাস না গড়াতেই হাটছে।
ভাল লাগছে হাটতে। রাতের আটটা। আকাশ জোড়া পূর্ণ চাঁদ। চারদিক চুপচাপ। টুপটাপ। কেমন যেন নিরবতার মাঝে মসৃন এক সুরেলা সুর ধেয়ে বেড়াচ্ছে। এটা কি বাতাসে পাতা নড়ার শিরশিরানী নাকি তারার ছুটে চলার ঐক্যতান। ঘরে ঢুকে পড়েছে সব মানব মানবী ইতিমধ্যেই। কেভিট ১৯-এর ভয়ে রাতের আটটাও বাজতে দেয় না যেন কেও। দিন রাত ঘরে থাকছে মানুষ।

তারপরও কিছুদিন আগে এক বিকেলে গিয়েছিল রানীর জন্মদিনে। সে দিন মানুষ ছিল এদিক ওদিক, কম ,তারপরেও ছিল। ড্রাইভ থু পাটির মিছিলে গাড়িতে চড়ে চক্কর দিতে সাইদদের খুব সাধ জেগেছিল। বিশাল একটা কি বোর্ড কিনেছিল সে রানীকে দেবে বলে, রানী গান তুলবে, টুং টাং করে বাজাবে। দিনভর গৃহবন্ধী রানীর জন্য ভাল উপহার। নন্দিনী বলেছে সব গিফট সে গ্যারাজে রাখবে পরের ৭ দিন, এতে ডিসইনফেক্টেড হবে নিজে নিজে। তারপরে সে ওগুলো ভাল মতন ক্লীন করে ঘরে তুলবে। যাই হোক ঐ বাহানায় সেই দিন সাইদ সেই বিকেলে ঘুরেছে ফিরেছে তার সাথে। রাজি করাতে গাল ফুলিয়ে বলেছে এই জীবনেও এই এতিমের কেও জন্মদিন করেনি। তাই কারও জন্মদিন হতে দেখলে আনন্দ হয়। নিহা সাথে সাথে বলেছে, ওরে মিথ্যুক ,তোমার বিদেশী মা করে আসছেন সবসময় জন্মদিন , হেপী বাথর্ ডে পাটিতো বিদেশীরাই বেশী করে। সাইদ মুখ ঝুলিয়ে বলেছে , নিজের মা তো আর করেনি, কোন দেশবাসী তো আর করেনি। নিহা এরপর আর কথা বাড়াতে না দিয়ে গেছে সাইদের সাথে বা সাইদকে সাথে নিয়ে গেছে রানীর জন্মদিনে। মানবিক কারনে গেছে,এমন একটা হাবভাব দেখিয়েই নিয়ে গেছে। কিন্তু সাইদের ভাব ছিল মহারাজার। গাড়ীতে সাইদ করেছে বাদরামীও। বলছে আপন মনে নিহাকে শুনিয়ে, দেখেছে কেও কখন এমন অভিসার। একজন ফাস্ট বেঞ্চে আরেকজন লাস্ট বেঞ্চে। বসবে পাশাপাশি। ধরবে হাত, দেখতে লাগবে কপোতকপোতী। তা না একজন নদীর এই কূলে আরেকজন নদীর পাতালে। নিহা পেছন থেকে বলেছে, দিনের চারটায় অভিসার, ভাল, তোমার নজরুলকে জিজ্ঞেস করবে এত আলোয় হয় নাকি অভিসার। সাথে সাথে সাইদ জবাব দিল, আছে নাকি চারদিকে আর কিছু। আমি তো অনুভব করছি পৃথিবী মানেই আমার এই গাড়িটা। এর বাহিরে সব বাতিল। চাঁদ সূর্য্যও গাড়ির ভেতরে। নিহা আর জানতে চাইলো না কোথায় চাঁদ সূর্য্য গাড়ির ভেতর। জানে জিজ্ঞাস করলেই নিজেকে সূর্য্য আর তাকে চাদ হিসাবে দেখিয়ে দেবে। তাই জিজ্ঞেস করলোনা। তাছাড়াও ঐসব কলেজ জীবনের প্রেমে জিজ্ঞাস্য হতে পারে। অর্বাচীন কথাবার্তা। কিন্তু ঐ প্রেমরোগীর কি সে খবর আছে। নাকি সে তার থেকে বয়সে ছোট বলে যা করে সে আনন্দ পাচ্ছে তাতে তার নিজের আনন্দ আসছে না। নাহ তাও না, সে তো যে রাগ দেখাচ্ছে বা বিরক্তি সেটা কপোট। মনে মনে তো ভাল লাগছে দেখতে এর পাগলামী। নিজেকে এর থেকে হঠাৎ করে দূরে ছুড়ে ফেলে দিতে গিয়ে আবার ধরে এনে পাশে রাখলো। এ ছেলে তাকে মজিয়ে রাখে, ভজিয়ে রাখে। ভৈরবী রাগে সুর তুলে তার মনে। সে স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু এতো কেবলই অনস্বীকার্য্য হয়ে উঠছে তার জীবনে। সাইদ বলছে, তুমি কি জান বাংলাদেশে সবাই গোপনে প্রেম করে,আর এখানে গুল্লাম গুল্লাম। নিহা বললো, গুল্লাম গুল্লাম নাহ, খুল্লাম খুল্লাম। সাইদ বলছে ,খুল খুল এটা কি ! আচ্ছা প্রেমটা যদি গোপনীয় না হয় তাহলে মজাটা কোথায়। ওখানে লূকোচুরি থাকবে, ইশারা থাকবে। চোখে চোখে কথা থাকবে। কিছু নেই এদের মাঝে। থ্রিলবিহীন প্রেম। ওরা ঘুরে বেড়ায় সবার সামনে দিয়ে। সবাই চেয়েও থাকে নির্বিকার ভাবে। আমার অফিসের মারভীনা নামের একটা মেয়ে ঢুকেছে, পরের দিনই সে নজরুলের সাথে প্রেম শুরু করেছে, নো চুপাচুপি, সারাদিন লেপটে আছে একজন আরেকজনের সাথে।

নিহা সহ্য করলো না নিরবে। এবার বলল স্কুল কলেজের ঐসব চুপীচাপের দিন দেশেও এখন শেষ। দেশেই এখন শুনেছি যেই মেয়ের প্রেমিক নেই তার বরও জোটে না। প্রেমিকই তো পরে বরে কনভার্ট হয়।
সাইদ সাথে সাথে বলল, নাউ আই নো হোয়াই ইউ আর সো এলোন। আমাকে প্রেমিক বানাও বর পেয়ে যাবে।
নিহা সাথে সাথে বলল, দূরে থাক। এই করোনার দিনে আমাকে আর বিরক্ত করো না। দূরে থাক।
সাইদ বললো, করুনা কর দেবী।
গাড়ি থামাও, নেমে যাব।
তারপরে কি পায়ে হেটে ঐ বাচ্চার ড্রাইভ থ্রু পার্টিতে যোগ দেবে। এখানে ডাক দিলে রিকশা বাস ট্রাম কিছুই পাবে না। এটা ডালাস।
সেজন্যই তো তোমার পোয়াবারো।
পোয়াবারো মানে কি? বারোটা পা।

নিহা বিরক্ত হবে না হেসে ফেলবে বুঝে উঠতে না উঠতেই মুখ থেকে যা বের হয়ে এলো তাই বলল, দেশ ছেড়েছো অনেক বছর বয়সে তাই মাপ করে দিলাম। জানতে চেয়েছো, ভাল কথা, কিন্তু তোমাকে শিখিয়ে লাভ কি, ব্যবহার হবে তোমার কোথায়, তোমার পুরা সারকেলটাইতো বিদেশী। তোমার বিদেশী পালক বাবা-মাকে শিখাবে? সাইদও সাথে সাথে বলল, না না বাংলা বেশ কঠিন ভাষা, ওদের এই বয়সে আমি আর কষ্ট দিতে চাই না। তবে আমার যে একজন খালা আছেন তাকে বলবো, উনি আছেন বলেই তো আমি এত সুন্দর বাংলা বলি।
ওরে আমার বাংলা বলিয়ে বাংরেজ। তোমার বাংলা শুনে তো আমি উল্টে মরে পড়ে যাই।
বলে নিহা হাসে।

সাইদ সেদিকে চেয়ে বলে, চাদের হাসি ব্রীজ ভেঙেছে। নিহা যা বুঝার বুঝে নিল, তার কথায় বাধ সাধলো না। বলল, সামনের দিকে চেয়ে থেকে গাড়ি চালাও। পেছনের দিকে চাইবে না।
চাইবো। যতবার খুশি চাইবো। এক গাড়িতে অথচ দুজন দুই সীটে, হয় নাকি।
তাহলে তুমি পিছনে এসে বস।
গাড়ি চলবে কিভাবে! ড্রাইভিং সিটতো পিছনে নেই।
শোন সাইদ সামাজিক দূরত্ব মেইনটেন কর।
আরে তোমার ইমিউন সিসটেম ডাবল। তুমি ছোটবেলাতেই বি সি জি টিকা দিয়ে রেখেছো। কুচ পরওয়া নেহি। আমাকে মনে হয় দেয়নি টিকাটা। এতিমদের যা হয় আর কি।
নিহা এবার ভ্রæ কুচকে বলল,আজকাল বেশি বেশি এতিম বলছো মনে হচ্ছে।
সাইদ সাথে সাথে বললো,হ্যাঁ তোমার মন পাবার জন্য। ঐ শব্দটা বললেই তোমার মন গলে, চোখ নরম হয়। নিহা বলল, কারণ আমিও তাই।
সাইদও হাত তুলে বলল, সেইম টু সেইম। সেকারনেই আমাদের দেখা হয়েছিল।
নিহা বলল, না, সে কারণে না, আমার একজন লইয়ার প্রয়োজন ছিল এইচ ওয়ান ভিসার ব্যাপারগুলো বুঝবার জন্য। সবাই বলল, ইয়েলো পেইজে সব পাবে। তখন ইয়েলো পেইজ দেখে মশী ভাই তোমাকে খুজে এনেছিলেন আমার জীবন হারাম করতে।
সাইদ চুটকি বাজিয়ে বললো,দেখলে তো তুমি কেমন সব পেয়ে গেলে, আমাকে পেয়ে, জোস একটা ডায়ালগ ছাড়লাম কি বল নিহানিকি।
সাইদ, একে বলে নাছোড়বান্দা।
কি বান্দা। আল্লারবান্দা জানি। কিন্তু না-চোর -বান্দা ! কে চোর?
কেও না,সাইদও না।
আমাকে মন চোর বলছো নিহি?
তুমি চুপ করবে সাইদ।
তুমি পাশে এসে বসলেই চুপ করবো নিহারিকা।
তাহলে এই খাবারগুলো ধরবে কে। সীটে যে এতগুলো খাবার রানীর জন্য নিয়ে বসেছি সে কথা খেয়াল আছে, নাকি নেই।

তুমি আমার থেকে খাবারগুলো বেশি ভালবাসবে এটা আমার পছন্দ হচ্ছে না নিহাকিকা মালবিকা।
নিহা এবার হেসে ফেললো, বললো আমার নামটা ঠিক ভাবে বলো, ভুলভাল বলবে না।
সাইদ মাথা দুলিয়ে বললো, আমি আসলে ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমাদের সাথে বেশ কিছু বাকস খাবার আছে,তোমার বাসার জন্যও আছে আমার বাসার জন্যও আছে। রানীর জন্যও আছে। কম বের হতে চাইলে বা কোয়ারাইন্টানে থাকাতে হলে লাগবে। তোমাকে দেখলেই এই হয় , সব ভুলে যায়ই। কিছুই মনে থাকে না নিকি। দুনিয়া অসার। না না দুনিয়া আগরবাতি,না দুনিয়া ঠকঠক , নোপ নোপ দুনিয়া দুনিয়া হচ্ছে ইস কি যে বলেছিল নজরুলটা।
নিহা হেসে না ফেলে আর কি করবে বুঝে উঠলো না। হেসেই বললো, প্রথম বারেই ঠিক মতন বলেছো। দুনিয়া অসার। আমি ছাড়া তোমার দুনিয়া অসার।
মানছো তাহলে নিনি!

নিহা জবাব দিল না। মাঝে মাঝে তার মনে হয় এ ইচ্ছে করেই ভুল ভাল ওলট পালট বলে,বকে।
সামনের রাস্তার পাশেই রানীকে দেখা গেল প্রজাপতি হয়ে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। দৌড়াদৌড়ি করে বারান্দায় উঠে যাচ্ছে আবার কার্ভ সাইডে ছুটে আসছে হাত নাড়াচ্ছে তার সামনে দিয়ে গাড়িতে বসা বন্ধু বা বান্ধবীদের আসা ও যাওয়ার উদ্দেশ্যে। ওরা ওদের বাবা বা মায়ের পাশে বসে হাত নাড়াচ্ছে। কি সুন্দর পবিত্র একটি দৃশ্য। ভিন্ন মহাদেশে দেশীয় একটি মেয়ের জন্মদিনে কত দেশের বন্ধুরা সমবেত হয়েছে, একেকজন একেক গাড়িতে। রানীর পাশে তার বাবা মাও দাঁড়িয়ে। মুখে হাসি। খুশী চোখে। নিহাকে দেখা মাত্র নন্দিনী এমন বাংলার পাঁচের মতন মুখটা করলো যে দেখে নিহা ঘাবড়ে গেল। কিরে বাবা একি। কুচকানো এক মুখ নিয়েই গাড়ির দিকে এগিয়ে এলো। কোমরে হাতও উঠছে। কে বলবে নিহা তার বান্ধবী। হাবেভাবে তো এক্কেবারে আম্মাজান। কিন্তু কারনটা সে বুঝতে পারছে না। দেরি করে ফেলছে কি! কিন্তু রানীর পছন্দের ঐ কেক, পেটিস, ডোনাট এইসব কিনতেই গিয়েই তো এত দেরি।
নন্দিনী কাছে এসেই হাউমাউখাউ করে যা বলল, তা হচ্ছে, কি বুঝে তুই সাইদকে ড্রাইভারের মতন একা সামলে বসিয়ে দিয়েছিস। নিহা থতমত খেল। নন্দিনীটা আজকাল বড্ড বেশী সাইদ ঘেষা হয়েছে। কিছু না বলে শুধু খাবারগুলো তুলে ধরবে ধরবে ভাবছিল কিন্তু তখনই সাইদ বলে বসলো, আমি জীবনভর ঐ মহা রানীর ড্রাইভার হয়ে থাকতে রাজী আছি।

রানীও ছুটি এসে জড়িয়ে ধরলো সাইদকে। বললো, ওফ মাই গড! ফাইনালি আই গট আ শোফার ।
নন্দিনীও সাথে সাথে বললো, আগে গাড়ির মালিক হও জানপরি তারপরে ড্রাইভারের খোজ করো।
নিহা রানীর আনন্দে ঝলমল করতে থাকা মুখটা ধরে রাখতে বললো, ইয়েস ড্রাইভ থ্রু বাথডে গার্ল হ্যাভ নাউ এন একসেলেন্ট শোফার উইথ কার। হ্যাপী বাথডে মা।
রানীও সাথে সাথে ছুটে গিয়ে গাড়িতে আটকে থাকা বান্ধবীদের জানাতে থাকলো তার খালার থেকে পাওয়া বিশাল গিফট আর দেখাতে থাকলো সাইদকে, দি শোফার।
নন্দিনী হায় হায় করে বললো, মানে আছে কোন! বাংলাদেশে হলে তো সাইদকে সবাই ড্রাইভার ভাই বা ড্রাইভার আংকেল বলে ডাকাডাকি শুরু করতো।

সাইদও সাথে সাথে বললো, আরে এতো কিছুই না,নস্যি একেবারে,আমিই তো বলেছি যে আমি জীবনভর ঐ মহা রানীর ড্রাইভার হয়ে থাকতে রাজী আছি, রানী তাই ভেবেছে তার ড্রাইভার,ভালই হয়েছে ,কেও তো সত্যিই খুশী হয়েছে, বলে হাসতে লাগলো, তারপরই ব্যস্ত হলো নন্দিনীকে ফিরিস্তি দিতে তাকে কি কি ভাবে অপদস্ত করে যাচ্ছে জগত সংসারের সামনে এই নিহারানী। তার অফিসের নজরুল যে কিনা ক্রমাগত তাকে জ্ঞান দিয়ে যাচ্ছে কিভাবে বাঙালি মেয়ে পটাতে হয় সে তার দূরাবস্তা দেখে বাঙালি মেয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে দুই দিনের মধ্যে এক সোনালী মেয়ের সাথে চুটিয়ে প্রেম করে দেখিয়ে দিচ্ছে। তার রেপুটেশন এখন খুবই খারাপ তার ঐ আধা আনা স্টাফ নজরুলের কাছে।
নন্দিনী একবার চোখ বড় করলো, একবার ছোট করলো, তারপর চেয়ে থাকলো তারপরে এক সময় হাসলোও। তার কারনে যে ঐ লোক এত মনগড়া সিচুয়েশেনের বয়ান দিয়ে গল্প ফাদতে পারে তা নিহার জানা ছিল না। আছে তো কোন নজরুল আদৈা তার অফিসে? নাকি নজরুলও বানানো।
(চলবে)