ঢাকামঙ্গলবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৩:২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মানুষই মানুষকে বাঁচায়, মানুষই মানুষকে মারে।

admin
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২ ১:৩৫ অপরাহ্ণ
পঠিত: 52 বার
Link Copied!

“মানুষই মানুষকে বাঁচায়, মানুষই মানুষকে মারে। মানুষই হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, আবার মানুষই এই বিভেদের রেখা মুছে ফেলতেও পারে।” – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

সত্যি কথাগুলো অত্যন্ত সহজ ভাষায়, তিনি অবলীলায় বলতে পারতেন। মানুষের মনের ভেতরের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, চাওয়া-পাওয়া, মহানুভবতা অথবা নিষ্ঠুরতা; সবই খুব স্বচ্ছ হয়ে উঠতো তাঁর লেখায়। তাই, তাঁর সৃষ্ট চরিত্ররা শুধুই ভালো বা শুধুই খারাপের সীমারেখা অতিক্রম করে, ভালোয় মন্দয় মেশানো, রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে উঠেছে খুব সহজেই।

প্রতিটি লেখকেরই একটি নিজস্ব দর্শন থাকে। সুনীল একটি কথা বলত। তার মর্মার্থ : ‘মহাকাল আমাকে মনে রাখবে কিনা, তা নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র ভাবিত নই। এখন যা লিখলাম, সেটা পড়ে তুমি আনন্দ পাচ্ছ কি-না, সেটিই আসল কথা। আমি যদি পাঁচটা খারাপ গল্প আর তিনটে বাজে উপন্যাস লিখে থাকি, দুনিয়ার কোনও মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।’ সুনীল বেশির ভাগ লেখায় সাহিত্যের প্যাঁচপয়জারের চেয়েও মানুষকে বেশি বিনোদন দিতে চেয়েছে।

‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার আদিযুগে সুনীল বিনোদন বিতরণের এই দায়িত্ব নেয়নি। সিগনেট প্রেসের স্বত্বাধিকারী ডি কে বা দিলীপকুমার গুপ্ত সুনীলকে খুব ভালোবাসতেন। ‘কৃত্তিবাস’ ছাপা হত ওই প্রেসেই। দীপক মজুমদার, আনন্দ বাগচী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তিন সম্পাদকই স্থির করেছিল, ওই পত্রিকায় তরুণরা কবিতা লিখবে। গদ্য ছাপা হবে শুধু বয়স্ক লেখকদের।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তার আগে ‘কল্লোল’, ‘কালিকলম’, ‘প্রগতি’ ইত্যাদি পত্রিকা ছিল। ছিল বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’। ‘কৃত্তিবাস’ তরুণ কবিদের মুখপত্র ঠিকই, কিন্তু সেটি ছাপতেও কাগজ কিনতে হয়, দফতরিকে বাঁধাইয়ের টাকা দিতে হয়। সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া এক দেশ, চারদিকে উদ্বাস্তুর মিছিল, জিনিসপত্রের দাম – সে বড় সুখের সময় নয়।

সুনীল নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে, বাবা স্কুলের মাস্টারমশায়। তাদের ভাড়াটে বাড়ির ভাড়াও সেই আক্রার বাজারে বাড়ছে। বড় ছেলেকে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়, সুনীলকেও অজস্র টিউশনি করতে হয়েছে। ‘জনসেবক’ কাগজে চাকরি নিতে হয়েছে। পরে আনন্দবাজার। আমার মতো অনেকে তখন শিক্ষকতার চাকরি নিয়েছে। কলেজে পড়ানোর মাইনে মাসে ৩২৫ টাকা।

আহা কি দুর্দান্ত যৌবন কাটিয়েছেন কবিতার সাথে তিনি। বইটার জোর হয়তো সেখানেই। উপন্যাস লিখতে ভয় পেতেন, ভাবতেন – আমি কি পারব? অর্থের জন্য তবুও লিখেছেন দেশ পত্রিকায় ‘নীললোহিত’ ছদ্মনামে। অর্থাভাব থাকলেও সুনীল কাটিয়েছেন এক বোহেমিয়ান জীবন। সময় পেলেই চলে যেতেন এখানে সেখানে।

খবরের কাগজে কবিতার ব্যাপার বিশেষ থাকে না। পাতা ভরানোর জন্য গদ্যই প্রধান। সুনীল ক্রমে এই বিষয়টিতে দক্ষ হয়ে ওঠে। প্রতিভার সঙ্গে দক্ষতার মিশেল ঘটলে যা হয়, সুনীলের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটল। কবিতাই তার প্রথম প্রেম। তবু টাকার জন্য তাকে গদ্য লিখতে হচ্ছে বলে বহুবার আক্ষেপ করেছেন সুনীল।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস জানে, এই গদ্যযাত্রার শুরু ‘দেশ’ শারদীয়া সংখ্যায় ‘আত্মপ্রকাশ’ উপন্যাস থেকে। সেটিই সুনীলের প্রথম উপন্যাস। ওর এক-দেড় বছর আগে-পিছে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় অনেকে উপন্যাস লিখছেন। প্রত্যেকে আগের প্রজন্মের সাহিত্যের ছক ভাঙার চেষ্টা করছেন।

সুনীল এই চেষ্টাটা নিল অন্যভাবে। নতুন আখ্যানরীতির গদ্য সে লিখল না, বরং কলকাতার নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজের মুখের ভাষাকে তুলে আনল। তৈরি হল জনপ্রিয় এক গদ্যরীতি। ঝরঝরে ভঙ্গি, যে কোনও লোকেই সেখান থেকে বিনোদনের আস্বাদ খুঁজে নিতে পারে। আবার সেই গদ্যরীতিতেই তৈরি হয় ‘গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প’র মতো ছোট গল্প। সুনীল বলত, একদিনে বসে গল্পটা লিখেছে। কিন্তু ওইভাবে তো লেখার রসায়ন তৈরি হয় না। অনেক দিন ধরেই তার মাথায় ওই গল্পের ছবি ঘুরত।

সুনীলের উত্থান আসলে কলকাতার মধ্যবিত্তের উত্থান। তার ভাষার উত্থান, চিন্তার উত্থান। ‘মনীষার দুই প্রেমিক’-এর মতো প্রেমের গল্প ছেড়ে সুনীল পরে ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’-র মতো বড় উপন্যাসে হাত দেয়। সেখানেও কিন্তু উনিশ শতকের নাগরিক কলকাতা। শরদিন্দু ঐতিহাসিক উপন্যাসে সামগ্রিক গৌড়মল্লার-এর ঝঙ্কার তোলেন, চেনা পরিবেশ ছেড়ে চলে যান তুঙ্গভদ্রার তীরে। কিন্তু সুনীল তার প্রিয় কলকাতার ইতিহাসকেই যেন ঘুরেফিরে দেখতে চায়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং গৌরদাস বসাকের সম্পর্কে সমকামিতা ছিল কি-না, ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত অবস্থান কী রকম ছিল, তাকেই পরখ করে নেয়। দুটি উপন্যাস লিখতেই প্রবল পরিশ্রম করেছিল সুনীল। উত্তরপাড়ার জয়কৃষ্ণ লাইব্রেরি থেকে বহু জায়গায় খুঁটে তথ্য আহরণ করেছিল। বাংলা সাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মানে শুধু প্রতিভা এবং দক্ষতার মেলবন্ধন নয়। তার সঙ্গে জুড়তে হবে প্রবল পরিশ্রমের দক্ষতা। পরিশ্রমের ক্ষমতা না থাকলে একই সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নীললোহিত এবং সনাতন পাঠক হওয়া যায় না।

সুনীল বাবুর বন্ধুদের অবশ্য একটি দুঃখ থেকে যাবে। খবরের কাগজে চাকরি নিয়ে ‘কৃত্তিবাস’ সম্পাদক বলেছিলেন, ‘সিস্টেমকে ভিতর থেকে ভাঙতে হয়। বাইরে থেকে ভাঙা যায় না।’ কিন্তু সিস্টেমকে ভাঙা যায়? সুনীল সত্যিই ভাঙতে চেয়েছিল? নাকি, ব্যবহার করতে চেয়েছিল? আর তা করতে গিয়ে নিজেই ক্রমশ হয়ে উঠেছিল ব্যবহৃত ব্যবহৃত এবং ব্যবহৃত! তবু সুনীল পাঞ্জা লড়েছিলেন!

পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘নন্দিনী’, অথবা শ্রীজাতর ‘রঞ্জিনী’, কিংবা নাটোরের ‘বনলতা সেন’ তেমনি সুনীলের নারী ‘নীরা’। সুনীলের প্রেম ‘নীরা’। পৃথিবীর যাবতীয় কবিতার আদিমতম প্রেরণা হলো নারী। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নারী হলেন ‘নীরা’।

তবে পৃথিবীর আর কোন কবি একটি মাত্র নাম ব্যবহার করে এত কবিতা লিখেছেন বলে জানা যায় না। তবে নীরা কি সুনীলের শুধু কল্পনার মানুষ নাকি জীবন্ত মানুষ এই নিয়ে সংশয় আছে।

সাহিত্যে সত্যিকারের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। প্রথম ভালবাসা ছিল তাঁর কবিতা। গল্প, কবিতা, উপন্যাস নিয়ে তাঁর বইয়ের সংখ্যা দুশোরও বেশি। আধা-বোহেমিয়ান জীবন যাত্রার সঙ্গে তিনি অবাধে মেলাতে পেরেছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন, জীবনের শেষ চার বছর সাহিত্য আকাদেমির সভাপতির দায়িত্ব সামলেছেন। বাংলা সাহিত্যের পুরো একটি প্রজন্ম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে অভিভাবক হিসাবে পেয়েছে। তাঁর মৃত্যু আক্ষরিক অর্থেই বাংলা সাহিত্যে একটি যুগের অবসান।

উনিশশো পঁয়ষট্টি সালে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস আত্মপ্রকাশ। বাংলা সাহিত্যে এক মহানক্ষত্রের জন্মের আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা সেই উপন্যাসে ছিল। তার পর থেকেই সাহিত্যিক হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত সুনীল। যদিও মধ্যরাতে কলকাতা শাসন করা চার যুবকের একজন হওয়ার সুবাদে কবি হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছেন আগেই। তখন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, শরত্কুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর সতীর্থ। কমলকুমার মজুমদার তাঁদের গুরু। তিনি শিষ্যদের ওয়েলিংটনের মোড়ে হেমলক পান করা শেখান। বাংলা আধুনিক কবিতার পত্রিকা কৃত্তিবাসের অন্যতম জনক সুনীল। রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করেই বাংলা কবিতা তখন আলাদা পরিচয় খুঁজছে। পরে অবশ্য রবীন্দ্রনাথের মুল্যায়নে তাঁদের অপরিণত বয়সের ভুল অকপটে স্বীকার করেছেন সুনীল।

স্কলারশিপ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান সুনীল। বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের দরজা খুলে যায় তখনই। বাংলায় লিখেছেন বটে, কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার অগ্রণী সাহিত্যের তিনি ছিলেন মনোযোগী পাঠক।

লেখক হিসাবে চুড়ান্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন সুনীল। প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে লিখতে বসতেন, গত পঞ্চাশ বছর ধরে অবিরল লিখে চলেছেন তিনি। শিশু ও কিশোর সাহিত্যে তাঁর সৃষ্ট কাকাবাবু এই বছরও ‌অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়েছেন। পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরে তাঁর জন্ম। কলকাতায় এসেছেন দেশভাগের সময়কার টালমাটাল পরিস্থিতিতে।

কলকাতার নাগরিক জীবনকে তিনি অনন্য সাধারণ মসৃণতায় নিয়ে এসেছেন সাহিত্যে। পরিণত বয়সে এসে রচনা করেছেন সেই সময়, প্রথম আলো অথবা পূর্ব পশ্চিমের মতো মডার্ন ক্ল্যাসিক। বাংলা সাহিত্যে বিরল গবেষণা এই বইগুলিকে সমৃদ্ধ করেছে। আবার ‘নীললোহিত’ ছদ্মনামে পায়জামা পরা ভবঘুরে বেকার চরিত্রটিকে একটা গোটা প্রজন্মের কাছে প্রায় আইকন করে তুলতে পেরেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

তবে কবিতা ছিল তাঁর প্রথম প্রেম। হঠাৎ নীরার জন্য থেকে তিনি এক রহস্যময়ীর সঙ্গে পরিচয় করালেন বাঙালি কবিতার পাঠকদের। পাঁচ দশক ধরে গবেষণা চলছে কোন নারী এই ‘নীরা’? সুনীলের মৃত্যুতেও হয়তো সেই গবেষণার অবসান হবে না।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নামের আগে ‘কথাসাহিত্যিক’ অভিধাটি অনেকটাই খণ্ডিত। কেননা, সুনীল কেবল কথাসাহিত্যিকই নন, তিনি বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবি ও অনুবাদকও। কবিতাপত্রিকা ‘কৃত্তিবাস’ থেকে ‘দেশ’ পত্রিকার কবিতা-সম্পাদকও ছিলেন তিনি। পাঁচ খণ্ডে তাঁর কবিতাসংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে। সে কারণে সুনীলের পরিচয়বাহী কোনও বিশেষণই বোধ হয় বাহুল্যমাত্র।

★ তথ্যসূত্র ও ঋণস্বীকার :- আনন্দবাজার পত্রিকা, জি নিউজ ডট ইন্ডিয়া ডট কম, রোর মিডিয়া, বাংলা ট্রিবিউন, সোশ্যাল মিডিয়া।