ঢাকামঙ্গলবার, ৩১শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৩:৪৮
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‘পুরানো কলকাতার ট্রাম: ১৮৭৩ থেকে ১৯৫৯’

ESAHARA NEWS
জানুয়ারি ১৯, ২০২৩ ৯:৫৮ অপরাহ্ণ
পঠিত: 32 বার
Link Copied!

‘পুরানো কলকাতার ট্রাম: ১৮৭৩ থেকে ১৯৫৯’
<>সে কবছরের আগের কথা হবে – মেরেকেটে মাত্র শ’খানেক বছর হবে হয়তো। তখন কলকাতা শহরে ট্রাম ছিল না, ট্যাক্সি ছিল না, বাসও ছিল না এবং এগুলো নিয়ে কোন কল্পনাও ছিল না। সেই সময় কলকাতা শহরে শুধুমাত্র ছিল পাল্কী ও ঘোড়ার গাড়ী। ‘ফিটন’, ‘স্প্রিংওয়ালা বগী’ প্রভৃতি ঘোড়ার গাড়ীর নাম ছিল ও সুন্দর সুন্দর পাল্কী মানুষেরা কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আরোহীদের দূর-দূরান্তে পৌঁছে দিত। তখন যত্রতত্র যাবার জন্য উড়িয়া বেহারাদের কাঁধে ধরা ঐ পাল্কীই ছিল মানুষের ভরসা। শেষে একটা সময়ে বেহারাদের ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে গোলমাল বেঁধেছিল এবং তার পরেই ‘ষ্টুয়ার্ট কোম্পানি’ প্রভৃতি বহু ঘোড়ার গাড়ীর কোম্পানি এদেশে জমিয়ে নিজেদের ব্যবসা শুরু করেছিল। ১৮৭৩ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকা থেকে জানতে পারা যায় যে, ওই সময় কলকাতায় প্রথমবারের জন্য ট্রাম চালাবার একটা চেষ্টা করা হয়েছিল৷ বিশেষতঃ অফিসের সময় ‘ডালহৌসি’তে পৌঁছাবার জন্যে ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের’ (ই. বি. আর) যাত্রীদের সুবিধার জন্য ঐ ট্রামের প্রবর্তন করা হয়েছিল। ১৮৭৩ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারী তারিখে ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকা লিখেছিল, “গতকল্য সকালে শিয়ালদহ টারমিনাসে কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটি অপ্রত্যাশিত ও অভাবনীয়ভাবে একটি ট্রামওয়ে চালু করল। একটি ঘোষণার দ্বারা নগরবাসীকে আগেই জানানো হয়েছিল যে, অদ্য প্রত্যুষে ট্রামওয়ে খোলা হবে। এই খবর নগরে ছড়িয়ে পড়বার পর থেকেই অধিকাংশ নেটিভরা কৌতুহলবশতঃ ষ্টেশনে এসে জড়ো হয়। ট্রামওয়ে সুপারিন্টেণ্ডেণ্ট মিঃ সি. এফ. এ্যাবরো সর্বপ্রথমে এসে হন্তদন্ত হয়ে ট্রাম ছাড়ার সমস্ত আয়োজন শেষ করলেন। জষ্টিস ইঞ্জিনীয়ার মিঃ ক্লার্ক একবার ষ্টেশনে এসে তাঁর নির্দেশগুলি ঠিকমত কাজ হচ্ছে কিনা ঘুরে-ফিরে দেখে গেলেন। প্রথম যে ট্রাম ছাড়বার ব্যবস্থা হয়েছিল তার সঙ্গে ছিল তিনটি গাড়ী। একটি প্রথম শ্রেণী ও দুটি দ্বিতীয় শ্রেণীর৷ প্রত্যেকটির সঙ্গে দুটি করে শক্তিশালী ঘোড়া জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। ঠিক সকাল ৯-১৫ মিনিটের সময় ই. বি. রেলওয়ে শিয়ালদহে এসে পৌঁছলে, যাত্রীরা চারিদিক থেকে ছুটে এসে টিকিট ক্রয় করে দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রাম ভর্তি করে ফেলল। দ্বিতীয় শ্রেণীর দুটি গাড়ীতে এত লোক উঠল যে, ছাত ও কামরার ভেতর ভর্তি হয়ে বাইরেও অনেক বাদুড়ঝোলা হয়ে ঝুলতে লাগল৷ শেষ পর্যন্ত এমন হল যে অবশিষ্টরা ট্রামে ওঠবার জন্যে কাকুতি মিনতি করতে লাগল, কারণ তাড়াতাড়ি অফিস পৌঁছানোর ঐ বাহনটিকে হাত ছাড়া করতে কেউই রাজী নয়। কিন্তু প্রথম শ্রেণীর ট্রামটিতে মাত্র গুটিকয়েক যাত্রী ছিলেন। মিঃ এ্যাবরো যে আশা করেছিলেন তার চেয়ে একেবারে কম। তিনজন ইউরোপীয়ান ও দু’জন নেটিভ সর্বসাকুল্যে ঐ প্রথম শ্রেণীর ট্রামটির যাত্রী হয়েছিলেন। অথচ দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রামে ছিলেন শিক্ষিত ও অশিক্ষিত প্রচুর যাত্রী, সেখানে এতটুকু জায়গা নেই, ট্রামে ওঠবার জন্যে আরও প্রচুর লোক ঠেলাঠেলি করছে। একশত দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিট নিয়ে টিকিট বিক্রেতা ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় তিনি দশটি টিকিটও বিক্রি করতে পারেন নি, অথচ প্রত্যেকটি দ্বিতীয় শ্রেণীর গাড়ীতে পঁয়তাল্লিশটি করে আসন নির্দিষ্ট ছিল। ট্রাম ষ্টার্ট করবার সময় অনেকক্ষণ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, সেইজন্য তাড়াতাড়ি ষ্টার্ট করবার জন্যে ৯-৩০-এর সময় সিগন্যাল দেওয়া হল। প্রথম শ্রেণীর অল্প যাত্রীপূর্ণ গাড়ীটি সিগন্যালের সঙ্গে সঙ্গে কোনরকম অসুবিধা না করে বেশ এগিয়ে গেল, কিন্তু যখন পুনরায় সিগন্যাল পড়ল, দ্বিতীয় গাড়ী এগোতে পারল না, দুটি শক্তিশালী ঘোড়া যেতে পারল না। ই. বি. রেলওয়ের ট্রাফিক সুপারিন্টেণ্ডেণ্ট মিঃ ব্রাণ্ডার হাতে চাবুক নিয়ে ঘোড়াদের সপাসপ, মারতে লাগলেন, কিন্তু কোন সুফল ফলল না। শেষকালে ট্রামওয়ের অজস্র ভৃত্যদের ঠেলাঠেলিতে গাড়ী কিছুটা এগোল এবং ঘোড়ারা অল্প একটু চলবার শক্তি পেল। অবশিষ্ট গাড়ীটিকেও সেই উপায়ে চালানো হল। মিঃ এ্যাবরো পুনরায় আদেশ দিলেন দ্বিতীয় ট্রাম প্রস্তুত করবার জন্যে এবং সে ট্রামের যাত্রী যেন ইউরোপীয়ানদের সংখ্যাই বেশী হয়। পুনরায় ৯-৫৫ মিনিটের সময় ই. বি. রেলওয়ে ট্রেন এসে পৌঁছাল। টিকিট নেবার জন্যে চারিদিক থেকে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। অফিসের সময় প্রায় উত্তীর্ণ হয়ে যায় বলে তাড়াতাড়ি প্রথম শ্রেণীর একটি ট্রাম ছাড়ার আয়োজন হল৷ সেই ট্রামে প্রচুর ইউরোপীয়ান যাত্রী উঠল এবং সঙ্গে একটি ‘Corresponding carriage attached’ করে আরও কিছু সংখ্যক যাত্রীকে তোলা হল। একটু আধটু অসুবিধা সৃষ্টি হওয়া ছাড়া প্রথম গাড়ি ছাড়তে কোন গণ্ডগোল হল না। খুব আস্তে আস্তে বৈঠকখানা স্ত্রীটের ওপর দিয়ে ট্রাম ডালহৌসি স্কোয়ারের কিঞ্চিৎ দূরে গিয়ে দাঁড়াল। যখন বৈঠকখানা স্ট্রীটের ওপর দিয়ে ট্রাম চলছিল, কাতারে কাতারে কলকাতাবাসী পথের দু’পাশে দাঁড়িয়ে এই নতুন গাড়ীটি দু’চোখ ভরে বিস্ময়ে দেখছিল, কতক নেটিভ লোক আবার ট্রামের পিছু পিছু দৌড়ে ডালাহাসি স্কোয়ার পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছল। ট্রামের ভৃত্যরা মাথায় লাল রঙের পাগড়ী বেঁধে ট্রামের পা-দানীতে চৌকিদারের মত দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল। যদিও এই ট্রাম মিউনিসিপ্যালিটির নির্দেশ অনুযায়ী চালিত হয়েছিল তবু ট্রামওয়েই ব্যয় করেছিল এর খরচ।” তাহলে ১৮৭৩ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি তারিখের ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকা থেকে জানা যাচ্ছে যে, কলকাতা শহরে প্রথম যে ট্রাম চলা শুরু হয়েছিল, সেটার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন ‘কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটি’ এবং তৎকালীন ট্রামওয়ে সুপারিন্টেণ্ডেন্ট ‘মি: সি. এফ. এ্যাবরো’। ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের অফিসযাত্রীদের ‘শিয়ালদহ’ থেকে দ্রুত ‘ডালহৌসি স্কোয়ারে’ পৌঁছে দেবার জন্যই সেই ট্রামের প্রবর্তন করা হয়েছিল এবং ‘নেটিভদের’ অর্থাৎ স্বদেশবাসীর সুবিধার চেয়ে ইউরোপীয়ানদের সুবিধার জন্যই সেই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। সুতরাং কলকাতার ট্রামওয়ের জন্ম-ইতিহাসের প্রথম তারিখটি যে ১৮৭৩ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারী, সোমবার ছিল – এ বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। ঐ নির্দিষ্ট দিনটি থেকে ঘোড়ায় টানা ট্রাম ‘শিয়ালদহ’ থেকে ‘ডালহৌসি স্কোয়ার’ ঘুরে ‘আর্মেনিয়ান ঘাট’ পর্যন্ত যেতে শুরু করেছিল। ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকার চিঠি-পত্র বিভাগে তখনকার দিনের কলকাতার ট্রামওয়ে যাত্রীদের যে কয়েকটি প্রতিবাদ-পত্র ছাপা হয়েছিল, সেগুলো থেকে জানতে পারা যায় যে, ওই ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলায় বহু অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছিল এবং কেউই সেগুলো সমর্থন করতে পারেন নি। তবে কেউ কেউ আবার সেই অসুবিধাগুলোকে এই বলে সমর্থন করেছিলেন যে – “We have to pay four pice for a seat in a ticca gharee and from three to four annas for a palkee when a gharee cannot be procured and gladly would be exchange both these for the tramway, if only the tramway would deign to offer us a seat.” প্রত্যেকদিন সকালে ‘ই. বি. রেলওয়ের’ যাত্রী ও ‘মাতলা রেলের’ যাত্রীদের নিয়ে শিয়ালদহ থেকে ডালহৌসি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়াই ছিল সেই ঘোড়ায় টানা ট্রামের কাজ। যাত্রীদের অফিসে পৌঁছে দিয়ে আবার পাঁচটার সময় অফিস থেকে নিয়ে এসে ঐ ই. বি. রেলওয়ে ও মাতলা রেলওয়ে ধরিয়ে দেওয়ার কাজটাও ছিল ওই মিউনিসিপ্যালিটি ট্রামের। কিন্তু ওই একই বছরের জুলাই মাসের ৯ তারিখের ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত একজন যাত্রীর একটি অভিযোগ-পত্র থেকে জানতে পারা যায় যে, ওই ট্রামের চলাচলে অনেক অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমতঃ ‘শিয়ালদহ টার্মিনাস’ থেকে ট্রামে চাপলে ট্রাম মাঝে কোথাও দাঁড়াত না, সেটা একেবারে সোজা ‘ডালহৌসি স্কোয়ারে’ গিয়ে থামত৷ ফলে ওই দুই জায়গার মাঝে যে সব যাত্রী থাকতেন, তাঁদের আলাদাভাবে গাড়ী ভাড়া করে শিয়ালদহ টার্মিনাসে এসে ট্রামে চড়া ছাড়া অন্য কোন গত্যন্তর ছিল না। এখন একটা পাল্কী ভাড়া করে যদি ট্রামে গিয়ে উঠতে হয় তাহলে সেই পাল্কীতে করেই অফিস যাওয়াটা সবচেয়ে সুবিধাজনক ছিল। অথচ ‘বৌবাজার’, ‘হাড়কাটা গলি’, ‘চাঁপাতলা’, ‘শিয়ালদহ চৌমাথা’র সামনে ট্রামের এক মিনিটের ষ্টপেজ দিলেই অনেকের সুবিধা হত। ওই ট্রামের যাত্রীদের অনেকেই কলকাতাবাসী ছিলেন, অতএব সেক্ষেত্রে তাঁরা সেই সব ষ্টেশন থেকে ট্রামে উঠতে পারতেন৷ এই সব নানা রকম অসুবিধার সৃষ্টি হতে হতে একদিন ওই ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া ঘোড়ায় ট্রাম টানার অনেক অসুবিধেও ছিল। যেমন, কলকাতার গরমে মানুষ বোঝাই ট্রাম টানতে গিয়ে অনেক ঘোড়া মরে গিয়েছিল। তখনকার দিনে এক একটি ভালো জাতের ঘোড়ার দাম ছিল অনেক। ভালো জাতের শক্তিশালী ঘোড়া না হলে আবার ট্রামের ঐ যাত্রীপূর্ণ গাড়ী টেনে নিয়ে যাওয়া ছিল মুস্কিল, তাই এক সময় বহু লক্ষ টাকা ব্যয় করেও কলকাতার প্রথম ট্রামওয়ে কোম্পানী শেষ পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল।

এর ঠিক ছ’বছর পরে, ১৮৭৯ সালের ৫ই মার্চ তারিখে প্রকাশিত ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে ছাপা হয়েছিল – “পাঠকগণের স্মরণ আছে কয়েক বর্ষ অতীত হইল ভূতপূর্ব জষ্টিসগণ সার ষ্টুয়ার্ট হগের সময়ে শিয়ালদহ হইতে লালদীঘি পর্যন্ত ট্রামওয়ে নির্মাণ করেন। সেই নির্মাণকার্যে করদাতাদিগের কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় জষ্টিসগণ পরিণাম চিন্তা না করিয়া সেই কার্যে হস্তক্ষেপ করায়, শেষে তৎসমস্ত অর্থ ব্যতীত আরও বহুল অর্থ বৃথা ব্যয়িত হয়। এক্ষণে প্রকাশ যে, বর্তমান মিউনিসিপাল কমিশনারগণ আবার কলিকাতায় ট্রামওয়ে নির্মাণ করিবার কল্পনা করিতেছেন। এ সংবাদ আমরা পূর্বে নগরে জানিতে পারি নাই। সম্প্রতি বোম্বাইয়ের সংবাদপত্রে তথাকার মিউনিসিপাল কমিশনারদিগের অধিবেশনের বিজ্ঞাপনী মধ্যে দৃষ্ট হয় যে, কলিকাতার মিউনিসিপাল কমিশনারগণ এবং সেক্রেটারী বোম্বাই মিউনিসিপালিটিকে তথাকার ট্রামওয়ে সম্বন্ধে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইয়াছেন। বোম্বাইয়ের ট্রামওয়ের কার্য উত্তমরূপে চলায় এবং তথায় করদাতাগণের অর্থ ক্ষতি না হইয়া বরং লাভ হওয়াতেই, রাজধানীর কমিশনারগণ জিজ্ঞাসা করিয়াছেন যে, কিরূপ উপায়ে ট্রামওয়ে নির্মাণ এবং চালাইলে সফল হইতে পারা যায়। বোম্বাইয়ের কমিশনার শীঘ্রই এ সম্বন্ধে উত্তর দিবেন বলিয়াছেন। এ সম্বন্ধে আমাদিগের মন্তব্য প্রকাশের পূর্বে বোম্বাইয়ের ট্রামওয়ে কিরূপে সাফলতা লাভ করিয়াছে, পাঠকগণের তদ্বিষয়ে জ্ঞাত হওয়া কর্তব্য। বোম্বাইয়ে প্রথমে ট্রামওয়ের প্রস্তাব হইলে, সকলেই মহা আপত্তি উপস্থিত করিয়াছিল। শেষে কমিশনারগণ মেসুয়স কেট্রিজ এবং কোম্পানীকে ট্রামওয়ে নির্মাণের ভার প্রদান করেন। … আমাদিগের মতে সর্বাগ্রে চিৎপুর হইতে ধর্মতলা ও লালদীঘি পর্যন্ত ট্রামওয়ে নির্মাণ করা কর্তব্য। ভাড়ার পরিমাণ অল্প করিলে প্রত্যহ সহস্ৰ সহস্র আরোহী যাতায়াত করিবে। কিন্তু ইহা করিতে হইলে, চিৎপুর রোডের পরিসর বৃদ্ধি করিতে হয়, নতুবা প্রত্যহ অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটিবার পূর্ণ সম্ভাবনা। উক্ত পথের পরিসর বৃদ্ধি করিলে সময়ে অশ্বের পরিবর্তে নবাবিষ্কৃত শব্দহীন ষ্টীম এঞ্জিন দ্বারা ট্রামওয়ে চলিতে পারিবে। … বাগবাজার, শোভাবাজার, বীডন স্ট্রীট, জোড়াসাঁকো, চোরবাগান, মেছুয়াবাজার, সিন্দুরিয়াপটী, লালবাজার, কসাইটোলা এবং শেষ ধর্মতলায় একএকটি ষ্টেশন করিলে সকলেরই সুবিধা হয় এবং তাহার দ্বারা বিলক্ষণ আয় হইবার সম্ভাবনা। কিন্তু এ পথটির পরিসর বৃদ্ধি না করিলে কোন মতেই এখানে ট্রামওয়ে নির্মাণ করা যাইতে পারে না। প্রথমে এই স্থানে ট্রামওয়ে নির্মিত হইলে পরে ইষ্ট ইণ্ডিয়ান এবং ইষ্টার্ণ বেঙ্গল রেলওয়ের সহিত সংযোগ এবং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, গ্রে ষ্ট্রীট, কলুটোলা ষ্ট্ৰট প্রভৃতিতে ক্রমে ক্রমে নির্মাণ করিলে চলিবে।” এরপরেই ১৮৭৯ সালের ১৭ই জুলাই তারিখের ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকায় কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কমিশনারদের কাছে ট্রামওয়ের জন্য দুটি টেণ্ডারের প্রস্তাব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম টেণ্ডার প্রস্তাবদাতা ছিলেন ‘জি. এ. কেট্রিজ’, তিনি বোম্বাই থেকে ১৮৭৮ সালের ৮ই নভেম্বর তারিখে লেখা একটি পত্রে কমিশনারদের কাছে তাঁর প্রস্তাবটি পাঠিয়েছিলেন। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে, বোম্বাইয়ের ট্রামওয়ের মত ‘ডবল ট্র্যাক’ ও ‘সিঙ্গল ট্র্যাকের’ জন্য তিনি প্রতি মাইলে দু’হাজার ও একহাজার টাকা করে ভাড়া দেবেন। কিন্তু ১৮৭৯ সালের ২০শে জানুয়ারি তারিখে ‘মিষ্টার আপটন’ তাঁর এক মক্কেলের প্রস্তাব দাখিল করেছিলেন। সেই প্রস্তাবটি ১লা ফেব্রুয়ারী তারিখে, কলকাতার টাউন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের সামনে, মিউনিসিপ্যাল সদস্য মহামান্য ‘কৃষ্ণদাস পাল’, ‘মিঃ উল’, ‘মিঃ ওয়েষ্টল্যান্ড’ ও ‘বাবু কালীনাথ মিত্র’ দাখিল করেছিলেন। মিঃ আপটনের মক্কেল, লণ্ডনের ‘ডিলুইন প্যারিশ’, ‘আলফ্রেড প্যারিশ’ ও লিভারপুলের ‘রবিনসন সুটার’ (Dillwyn Parrish, Alfred Parrish of London and Robinson Soutter of Liverpool) মিলিতভাবে, ‘মেসার্স প্যারিশ এন্ড সুটার কোম্পানি’ নাম দিয়ে, ১৯শে ফেব্রুয়ারী তারিখে কলকাতা করপোরেশনের কাছে ইঞ্জিনীয়ারের একটি খসড়া পেশ করেছিলেন। ওই খসড়ায় জানানো হয়েছিল যে, যদি কলকাতায় তাঁদের ট্রামওয়ে চালু করতে দেওয়া হয় তাহলে করপোরেশনের রাস্তা সারানোর ২৮,০৮৬ টাকা খরচ বেঁচে যাবে। এর পরে ‘মি: কেট্রিজ’ ও ‘প্যারিশ অ্যাণ্ড সুটার কোম্পানি’র দুটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

১) কেট্রিজের প্রস্তাব ছিল –

ডবল ট্র্যাক: ৯.৪ মাইলে ২,০০০ টাকা

সিঙ্গল ট্র্যাক: ৩.৪ মাইলে ১,০০০ টাকা

মোট: ১২.৮ মাইলে ২২,২০০ টাকা।

২) মেসার্স প্যারিশ এন্ড সুটার কোম্পানির প্রস্তাব ছিল –

ডবল ট্র্যাক: ১১.২৭ মাইলে ৩,০০০ টাকা

সিঙ্গল ট্র্যাক: ৫ মাইলে ২,০০০ টাকা

মোট: ১৬.২৭ মাইলে ৪৩,৭৫০ টাকা।

শেষ পর্যন্ত ‘কেট্রিজ’ নিজের প্রস্তাবটি তুলে নিয়েছিলেন এবং ‘মেসার্স প্যারিশ অ্যাণ্ড সুটার কোম্পানি’ কলকাতা শহরে ট্রামওয়ে চালু করবার আদেশ পেয়েছিলেন।

ওই ‘মেসার্স প্যারিশ এণ্ড সুটার কোম্পানি’ ছিল বর্তমানের ট্রাম কোম্পানীরই পূর্বপুরুষ। ওই কোম্পানিই ১৮৭৩ সালের পরে আবার কলকাতায় ট্রামওয়ে চালানোর ব্যবস্থা করেছিল। করপোরেশনের বিভিন্ন বৈঠকে আলাপ-আলোচনা, এগ্রিমেন্ট ইত্যাদিতে সই ও রাস্তায় লাইন ইত্যাদি বসাতে বহুদিন গত হবার পরে, শেষ পর্যন্ত ১৮৮০ সালের ১৩ই নভেম্বর তারিখে কলকাতায় স্থায়ীভাবে ট্রামওয়ে চালু হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে ১৮৮০ সালের ১৫ই নভেম্বর, সোমবার প্রকাশিত ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল – “শনিবার বিকালে মিষ্টার রবিনসন সুটারের সৌজন্যে শহরের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মিউনিসিপ্যাল কমিশনারগণ ডালহৌসি স্কোয়ার থেকে একটি ট্রামে চেপে শিয়ালদহ ডিপোতে এসে পৌঁছলেন। সমগ্র ভদ্রমহোদয়গণ শিয়ালদহে পৌঁছে ঘোড়াদের আস্তাবলে গিয়ে তাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও আরামে অপেক্ষা করতে দেখে নতুন ট্রামওয়ে কোম্পানীর সাফল্য ঘোষণা করলেন। প্রচুর বিশ্বাসের মধ্যে সেদিনটি চিরঅক্ষয় করে মিঃ ম্যাক আলপাইন হর্ষোৎফুল্ল স্বরে বলে উঠলেন, ‘উপস্থিত ভদ্রমহোদয়গণ, শহরে আজ যে নতুন ট্রামওয়ে কোম্পানি ব্যবসা শুরু করলেন, আমি মনে করি, এই কোম্পানী বর্তমানে আমাদের যে অপূর্ব সুযোগ প্রদান করলেন, তাতে আমাদের উৎসাহে উপস্থিত ভদ্রমহোদয়গণের সমর্থনে আজকের এই শুভ মুহূর্তটি তাঁদের সে শক্তিকেই অভিনন্দন জানানো হল। মিঃ সুটার আমাদের দেখালেন, আজকে যে উত্তম ও কম মূল্যে যানবাহনের চলাফেরা অথচ এই মূল্যবান মুহূর্তটি আমাদের এই শহর জীবনে আর একদিন এসেছিল। কিন্তু সেদিন কেন যে অকৃতকার্য হয়েছিল আজ এই মুহূর্তে আমি তা বলতে পারি না। তবে আজকের এই আয়োজন নিজের চোখে দেখে আমার বিশ্বাস হয় যে, যদি নগরবাসীর সত্যিকার উপকার করতে এই ব্যবস্থা সুষ্ঠুরূপে সম্পন্ন হয় তাহলে এদেশের লোকেরা কখনই একে অবহেলা করবে না। এই ট্রামওয়ে কোম্পানি যদি শহরবাসীর স্বার্থের দিকে তাকিয়ে যাতায়াতের ব্যবস্থাটি সুন্দরভাবে পরিচালনা করেন তাহলে আমি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি যে, ইহা কখনই অবহেলিত হবে না, সম্পূর্ণ অল্পমূল্যে ভাড়া ও অতিব্যবহারে লোকের অভিনন্দনে ধন্য হবে। মিঃ রবিনসন সুটার বললেন যে, তিনি উপস্থিত কমিশনারগণ ও বিশিষ্ট ভদ্রমহোদয়গণের উপস্থিতিতে কৃতজ্ঞ। তবে তাঁদের এই অভিনন্দন মনে প্রাণে স্বীকার করতে পাচ্ছেন না। এই জন্যে যে, শেষ পর্যন্ত এই কোম্পানী থাকবে কিনা তার কোন ঠিক নেই। কারণ সব সময়েই মনে হচ্ছে এই কোম্পানী বুঝি অকৃতকার্য হয়েই একদিন ফিরে যাবে। তাঁর বিশ্বাস আছে যে, ভবিষ্যতে তাঁরা নিশ্চয় সফলতা অর্জন করবেন তবে এই আরম্ভের মুহূর্তে হঠাৎ বিশ্বাস ভেঙ্গে গেছে কয়েকটি লোকের কথায়, তাঁরা মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছেন, কলকাতাবাসী কেউই এ গাড়ীতে উঠবে না, তবে তাঁদের কথায় এও বিশ্বাস আছে যে, এই ব্যবস্থা যদি কলকাতাবাসীর সুখ ও সুবিধার দিকে তাকিয়ে দ্রুত উন্নতি করা হয় তাহলে কলকাতাবাসী কখনই একে অবহেলা করবে না। মিঃ সুটার আরও বললেন যে, অন্যান্য শহরের মত এখানেও শহরবাসীর সমর্থন পেলে কিছুদিনের মধ্যেই চল্লিশ হাজার যাত্রী এক, দেড় মাইলে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দেখানো যাবে। প্রশ্ন যে, ট্রামওয়ে কোম্পানির যেমন উত্তম ব্যবস্থা ও সুষ্ঠু পরিচালনা নির্ভরযোগ্য তেমনি জনসাধারণের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও পরিপূর্ণ সমর্থন না পেলে কখনই এ কোম্পানি দ্রুত উন্নতি করতে পারবে না। সুটার মিউনিসিপ্যাল কমিশনারগণের উপদেশ, ইঞ্জিনীয়ার মি: কিম্বারের সাহায্য ও লাইন কন্ট্রাক্টর মেসার্স বার্ণ অ্যাণ্ড কোম্পানীর শক্তি প্রার্থনা করে বললেন, কলকাতা শহরের কমিশনারগণের স্বাস্থ্য যেন ভাল থাকে এবং বিশেষ করে মহামান্য কৃষ্টদাস পালের নাম উল্লেখ করলেন। মহামান্য কৃষ্টদাস পাল বৈকালের শুভ মুহূর্তটি কামনা করে শহরের ট্রাম চলাচলের দিনটি অক্ষয় করে রাখবার জন্য কটি কথা বললেন।” ওই ১৮৮০ সালের ১৩ই নভেম্বর তারিখে, কলকাতা ট্রামওয়ের দ্বিতীয় জন্মটি ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। ওই দিন থেকেই কলকাতা শহরে আবার ট্রাম চালনা শুরু হয়েছিল এবং ‘মেসার্স প্যারিশ অ্যাণ্ড সুটার কোম্পানি’ সেটার পরিচালনার ভার পেয়েছিল৷ প্রথমে ‘শিয়ালদহ’ থেকে শুরু হয়ে, তারপরে ১৮৮১ সালের মার্চ মাসে ‘চিৎপুরে’, নভেম্বর মাসে ‘চৌরঙ্গী’তে, ১৮৮২ সালের নভেম্বর মাসে ‘ধর্মতলা’য়, জুন মাসে ‘শ্যামবাজারে’ ও ‘স্ট্র্যাণ্ড রোডে’ এবং এইরকমভাবে কলকাতা শহরের চারিদিকে ঊনিশমাইল পর্যন্ত ওই ট্রামওয়ে চালু হয়েছিল। ১৮৮২ সালের মে মাসে ‘খিদিরপুরের’ দিকে ‘স্টিম ইঞ্জিন যুক্ত ট্রাম’ শহরের ভিতরে বেশী চালু হতে পারে নি এই জন্যে যে, স্টিম ইঞ্জিনযুক্ত ট্রাম বেশী শব্দ করত এবং সেই জন্য শহরবাসীর সুখশান্তি বিনষ্ট হচ্ছিল বলে তাঁরা প্রতিবাদ করে ওই ব্যবস্থাকে শহরের ভিতর থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন।

এরপরে ১৮৯৯ সালে কলকাতায় বিদ্যুৎ এসেছিল। ১৯০০ সালের ১০ই জানুয়ারি, বুধবার প্রকাশিত বিভিন্ন পত্র ও পত্রিকায় দেখা গিয়েছিল যে, কলকাতার ট্রামওয়ে কোম্পানি গত মে মাসে করপোরেশনের কাছে ইলেকট্রিক ট্রামওয়ের জন্য এই মর্মে একটি পত্র প্রদান করেছিল, যাতে তারা ১৮৯৮ সালের স্টেটমেন্ট ও একাউণ্টস দাখিল করে জানিয়েছিল যে, অবিলম্বে ইলেকট্রিক ব্যবস্থা চালু না হলে, কলকাতায় ট্রামওয়ে চালানো তাঁদের পক্ষে অসুবিধাজনক হবে। করপোরেশনের তৎকালীন ডাইরেক্টর তাঁদের একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করে নতুন করে ১৯০১ সালের ১লা জানুয়ারি তারিখ থেকে ৩০ বছরের অধিকার দিয়ে ট্রামের জন্য ইলেকট্রিক ব্যবস্থা চালু করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু একই সাথে শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, ট্রাম কোম্পানিকে তিন বছরের মধ্যে সেই ইলেকট্রিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং সেটার জন্য ৩৫ হাজার টাকা করপোরেশনকে দিতে হবে। করপোরেশনের ওই শর্তে ট্রামওয়ে কোম্পানি স্বীকৃতি জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিজলী শক্তিচালিত ট্রাম চালু করবার জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছিল। কারণ, এর আগে তারা ঘোড়ার দ্বারা ট্রাম চালিয়ে যে অসুবিধা ভোগ করেছিল, আর সেই অসুবিধা ভোগ করতে তারা কোন মতেই রাজী ছিল না৷ কারণ, ঘোড়ায় টানা ট্রামের যুগে দৈনন্দিন প্রায় দু’চারটি করে ঘোড়া হয় কলকাতা শহরের গরমে মারা পড়ত, আর না হয় ক্ষীণজীবী হয়ে হঠাৎ একদিনের পথের ওপরে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ত। অথচ বিদেশ থেকে বহু মূল্য দিয়ে ট্রাম কোম্পানিকে তেজিয়ান ঘোড়া কিনে আনতে হত, না হলে ট্রামের বোঝা বওয়া রীতিমতো মুস্কিলের ব্যাপার ছিল। ওই সব অসুবিধে ভোগ করে, কম মুনাফা করে ট্রাম কোম্পানির পক্ষে আর ট্রাম চালানো কোন মতেই সম্ভব হয়ে উঠছিল না। ফলে বৈদ্যুতিক যন্ত্রের সুযোগ কোন মতেই ট্রাম কোম্পানি ছাড়তে রাজি হয়নি। ১৯০০ সালে কলকাতা শহরে বৈদ্যুতিক ট্রামের সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছিল। সেই কাজ শেষ হয়েছিল ১৯০২ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত কলকাতার ট্রাম বৈদ্যুতিক শক্তিতে বলীয়ান।

১৯০২ সালের ডিসেম্বর মাসটিও কলকাতা ট্রামওয়ের জীবনের একটি স্মরণীয় কাল৷ তখন কলকাতার মোট ট্রাম লাইনের দৈর্ঘ্য ছিল ১৯ মাইল, আর গাড়ী ছিল ১৮৬টি। এরপরে ১৯১৪ সালে একলাফে কলকাতা শহর জুড়ে ট্রাম লাইনের দৈর্ঘ্য বেড়ে হয়েছিল ৩০ মাইল। ট্রাম লাইনের দৈর্ঘ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা ও হাওড়ায় দিনের পর দিন যাত্রীর সংখ্যা কত বেড়েছিল, সেই হিসেবটাও লক্ষ্য করবার মত। ১৯৩৯ সালে কলকাতা ও হাওড়ার ট্রামে যাতায়াত করেছিলেন ১০ কোটি ৬৪ লক্ষ যাত্রী। ১৯৫০ সালে সেই সংখ্যাটা বেড়ে হয়েছিল ৩২ কোটি ৪৩ লক্ষ। ১৯৫২ সালে – ৩৮ কোটি ৩৭ লক্ষ। ১৯৫৫ সালে – ৩৮ কোটি ৪১ লক্ষ। ১৯৫৭ সালে – ৪০ কোটি ১৯ লক্ষ। ১৯৫৯ সালে ট্রামের যাত্রী সংখ্যা কমে হয়েছিল ৩৮ কোটি ৭২ লক্ষ ৯ হাজার দুশো আট জন। এত কোটি কোটি যাত্রী বহন করে ট্রাম কোম্পানির আয়ও লক্ষ্য করবার মত হয়েছিল। ১৯৫০ সালে কলকাতা ও হওড়ায় (মাসিক টিকিট সমেত) ট্রাম কোম্পানির নগদ আমদানী হয়েছিল ২ কোটি ১১ লক্ষ ৬৫ হাজার ১ শত ২৭ টাকা৷ ১৯৫২ সালে সেই আমদানীর পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২ কোটি ৪৯ লক্ষ ১১ হাজার ৯ শত ৬৪ টাকায়। ১৯৫৫ সালে – ২ কোটি ৫২ লক্ষ ৭২ হাজার ৪ শত ১৮ টাকা। ১৯৫৭ সালে – ২ কোটি ৬০ লক্ষ ১৫ হাজার ৮ শত ৫২ টাকা। ১৯৫৯ সালে সেই আমদানীর পরিমাণ ছিল – ২ কোটি ৭৪ লক্ষ ৯৭ হাজার ১ শত টাকা। ট্রাম কোম্পানীর গাড়ী পিছু যাত্রী সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছিল। ১৯৩৯ সালে প্রতি ট্রাম গাড়ীতে ৩ লক্ষ ৪০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে যাতায়াত করেছিলেন ৪ লক্ষ ৮৫ হাজার যাত্রী। আর ১৯৫৭ সালে প্রতি ট্রামে ৯ লক্ষ ৬৬ হাজার জন যাত্রী যাতায়াত করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে কলকাতা ও হাওড়ায় মোট ৩১৩টি ট্রাম ছিল। ১৯৫০ সালে ছিল ৩৭৭টি ট্রাম৷ ১৯৫২ সালে ৪১১টি ট্রাম। ১৯৫৩ সালে রাস্তায় বেরিয়েছিল ৪০২টি ট্রাম। ১৯৫৫ সালে মোট ট্রাম ছিল ৪১৭টি, আর রাস্তায় নেমেছিল ৪১৬টি ট্রাম। ১৯৫৬ সালে সেই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৪১৬ টি ও ৪১২টি এবং ১৯৫৭ সালে ৪১৬টি ও ৪১৫টি। এরপরে কলকাতা শহরে ট্রামের সংখ্যা আর বাড়েনি। ১৯৫৯ সালের হিসেবে প্রতিদিন ট্রাম কোম্পানিকে যাত্রীদের টিকিট সরবরাহ করার জন্য, ৪ পাউণ্ড কাগজের টিকিট সরবরাহ করতে হত।

(তথ্যসূত্র:রানা